নীরব ঘাতক প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণগুলো কী?

print sharing button
copy sharing button

নীরব ঘাতক প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণগুলো কী?

পুরুষদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। কিন্তু এ রোগের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হল—অনেক সময় এটি কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই শরীরে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে। এ কারণেই প্রোস্টেট ক্যান্সারকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’।

বহু পুরুষ বুঝতেই পারেন না যে তাদের শরীরে ক্যান্সার বাসা বাঁধছে। কারণ রোগের শুরুর দিকে সাধারণত তেমন কোনো অস্বস্তি বা লক্ষণ টের পাওয়া যায় না। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়াও অনেক সময় বিলম্বিত হয়।

এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক এবং বেথ ইসরাইল ডিকোনেস মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসক ডা. মার্ক বি. গার্নিক, হার্ভার্ড হেল্থ পাবলিশিং-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন— ‘প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত অধিকাংশ পুরুষই রোগ শনাক্ত হওয়ার সময় কোনো উপসর্গের কথা জানান না।’

তবে সব ক্ষেত্রেই যে রোগটি সম্পূর্ণ নিঃশব্দ থাকে, তা নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে কিছু সতর্ক সংকেত দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণকে অবহেলা করা একেবারেই ঠিক নয়, কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে প্রোস্টেট ক্যান্সার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য।

প্রাথমিক পর্যায়ে উপসর্গ যে কারণে স্পষ্ট হয় না 

প্রোস্টেট একটি ছোট গ্রন্থি, যা মূত্রনালির খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। ক্যান্সার যদি ছোট আকারে থাকে এবং আশপাশের টিস্যু বা কোষে চাপ না দেয়, তাহলে শরীর থেকে কোনো সতর্ক সংকেত আসে না।

ডা. মার্ক বি গার্নিক বলেন, ‘অনেক পুরুষের ক্ষেত্রে ক্যান্সার ধরা পড়ে নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে, যখন তারা পুরোপুরি উপসর্গহীন। এ কারণেই নির্দিষ্ট বয়সের পর নিয়মিত স্বাস্থ্য-পরীক্ষার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।’

মূত্রত্যাগে পরিবর্তনই প্রথম ইঙ্গিত 

যখন প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো উপসর্গ দেখা দেয়, তখন তা সাধারণত মূত্রত্যাগের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়।

প্রোস্টেট বড় হতে থাকলে এটি মূত্রনালির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ পাওয়া, হঠাৎ তীব্র চাপ অনুভব করা, প্রস্রাব শুরু করতে সময় লাগা, মাঝপথে ধারা থেমে যাওয়া কিংবা প্রস্রাবের পরও মনে হওয়া যে মূত্রথলি পুরোপুরি খালি হয়নি— এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেককে রাতে বারবার ঘুম থেকে উঠে প্রস্রাব করতে হয়।

যে কারণে এই উপসর্গগুলো বিভ্রান্তিকর 

এই সমস্যাগুলো শুধু ক্যান্সারের ক্ষেত্রেই হয় না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রোস্টেটের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, যাকে ‘সৌম্য প্রোস্টেট বৃদ্ধি’ও বলা হয়। আর এই ক্ষেত্রে একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায়। আবার প্রোস্টেট বা আশপাশের অংশে প্রদাহ হলেও মূত্রত্যাগে জ্বালা বা অস্বস্তি হতে পারে।

ডা. মার্ক বি গার্নিক ব্যাখ্যা করেন, ‘অনেক সময় মূত্রথলির সমস্যার কারণেও প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া হতে পারে, যা প্রোস্টেটের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। তাই শুধু উপসর্গ দেখে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে এটি ক্যান্সার কিনা।’

চিকিৎসক যেভাবে পার্থক্য নির্ণয় করেন 

উপসর্গ নিয়ে কেউ চিকিৎসার জন্য গেলে প্রথমেই প্রদাহ বা মূত্রথলির সমস্যা না থাকলে চিকিৎসক ‘সৌম্য প্রোস্টেট বৃদ্ধি’ এবং ক্যান্সারের মধ্যে পার্থক্য খোঁজেন।

ডা. মার্ক বি গার্নিক জানান, ‘সৌম্য প্রোস্টেট’ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সাধারণত দুই ধরনের সমস্যা একসঙ্গে দেখা যায়— প্রস্রাব বের হতে বাঁধা এবং মূত্রথলি অতিসংবেদনশীল হয়ে ওঠা। তবে কেবল মূত্রথলির অতিসংবেদনশীলতার লক্ষণ হঠাৎ দ্রুত বেড়ে গেলে, সেটা ক্যান্সারের ক্ষেত্রে সতর্ক সংকেত হতে পারে।

 

শারীরিক পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা 

প্রোস্টেট পরীক্ষা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হল- শারীরিক স্পর্শের মাধ্যমে গ্রন্থির আকার ও গঠন বোঝা।

যদি প্রোস্টেট সমানভাবে বড় হয়, তাহলে তা সাধারণত ‘সৌম্য’ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। তবে যদি কোনো অংশ শক্ত বা অসমান মনে হয়, তাহলে পরীক্ষা করার দরকার হয়।

রক্তপরীক্ষা ও আধুনিক স্ক্যান 

রক্তে একটি নির্দিষ্ট উপাদানের মাত্রা মাপার মাধ্যমে প্রোস্টেটের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে এই মাত্রা সৌম্য বৃদ্ধি ও ক্যান্সার— দুই ক্ষেত্রেই বাড়তে পারে। তাই চিকিৎসকেরা প্রায়ই কিছু ওষুধ দিয়ে কয়েক সপ্তাহ পর আবার পরীক্ষা করেন।

যদি মাত্রা অস্বাভাবিক থাকে, তখন প্রোস্টেটের ভেতরের গঠন দেখতে বিশেষ ধরনের চিত্রায়ন পরীক্ষা করা হয়।ডা. মার্ক বি গার্নিক বলেন, ‘যদি এই পরীক্ষায় অস্বাভাবিক কিছু ধরা না পড়ে এবং প্রোস্টেটের আকারের সঙ্গে পরীক্ষার ফল সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে কিছু ক্ষেত্রে আপাতত অস্ত্রোপচারমূলক পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।’

বড় পর্যায়ে পৌঁছালে যা ঘটে

প্রোস্টেট ক্যান্সার অনেক দূর ছড়িয়েও কখনো কখনো উপসর্গহীন থাকতে পারে। তবে যখন এটি হাড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাধারণত ব্যথা শুরু হয়।পিঠ, কাঁধ বা শরীরের এমন অংশে ব্যথা হতে পারে, যেখানে স্নায়ুর কাছাকাছি ক্যান্সার কোষ জমা হয়।

ডা. মার্ক বি গার্নিকের মতে, ‘যদি কারো দীর্ঘদিনের পিঠব্যথা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং সাধারণ চিকিৎসায় না কমে, তাহলে আরও বিস্তৃতভাবে পরীক্ষা করা জরুরি।’

ক্লান্তি ও ওজন কমে যাওয়া কি লক্ষণ হতে পারে?

অনেক ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অকারণে ওজন কমে যাওয়া বা চরম ক্লান্তি দেখা যায়। তবে প্রোস্টেট ক্যান্সারে সাধারণত এসব লক্ষণ খুব দেরিতে আসে।

ডা. মার্ক বি গার্নিক জানান, রোগটি যদি শরীরের বহু জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে, তখনই কেবল এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রাথমিক বা মধ্যবর্তী পর্যায়ে এগুলো খুব একটা চোখে পড়ে না।

About SIAM AHAMMED

Check Also

যে র’ক্তের গ্রুপে স্ট্রো’ক হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি

যে র’ক্তের গ্রুপে স্ট্রো’ক হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি নিজস্ব প্রতিবেদক: রক্তের গ্রুপের সঙ্গে ব্রেন স্ট্রোকের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *