দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এক পরজীবীর সংক্রমণ নিয়ে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা বলছেন, ‘স্নেইল’ বা শামুকের মাধ্যমে ছড়ানো এই পরজীবীর সংক্রমণে হতে পারে ‘স্নেইল ফিভার’ নামের এক রোগ। এই সংক্রমণ এত দ্রুত ছড়াচ্ছে যে ভবিষ্যতে এটি নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
রোগটির প্রভাবে মানুষের যৌনাঙ্গে ক্ষত, বন্ধ্যত্ব এবং এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, বছরে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ স্নেইল ফিভারের চিকিৎসা নেন। এদের বেশির ভাগের বাস আফ্রিকা মহাদেশে। তবে সম্প্রতি বিশ্বের ৭৮টি দেশে এই রোগের সংক্রমণের খবর জানা গেছে। এর মধ্যে আছে চীন, ভেনেজুয়েলা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ।
পরজীবীটি ত্বকের ভেতর দিয়ে শরীরে ঢোকে এবং রক্তে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে। এরপর নীরবেই ডিম পাড়ে; আর এই ডিম জমা হয় মানবদেহের লিভার, ফুসফুস ও যৌনাঙ্গে। দীর্ঘ সময় মানুষের শরীরে এর উপস্থিতি থাকলেও তা ধরা নাও পড়তে পারে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই পরজীবীর সংক্রমণে হওয়া রোগটির ধরন ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) এই রোগটিকে ‘বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ’ বলে মনে করছে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, পরজীবীটির গঠন ও বৈশিষ্ট্যে বেশ পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে এটি নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্নেইল ফিভার যেভাবে ছড়ায়
যে পরজীবীর কারণে স্নেইল ফিভার রোগটি হয়, সেটির বাহক মূলত একটি বিশেষ ধরনের শামুক। এই শামুক যে পানিতে থাকে, সেখানে এই পরজীবীর লার্ভা পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। যদি কোনো মানুষ বা প্রাণী এই পানির সংস্পর্শে আসে, তবে তার স্নেইল ফিভার হতে পারে।
লার্ভাগুলো ত্বকের ভেতর দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। এরপর এগুলো ধীরে ধীরে মানুষের শরীরের ভেতরে বড় হয়ে পূর্ণবয়স্ক কৃমিতে পরিণত হয় এবং রক্তনালিতে বসবাস শুরু করে। স্ত্রী কৃমিগুলো ডিম পাড়ে। এই ডিমের কিছু অংশ মল বা প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। তবে অনেক ডিমই শরীরের ভেতরে আটকে যায়। পরে তা শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ধ্বংস করতে গিয়ে আশপাশের সুস্থ টিস্যুকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি হতে পারে।
কিছু ডিম তলপেট ও যৌনাঙ্গের আশপাশে আটকে যায়। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘ইউরোজেনিটাল স্কিস্টোসোমিয়াসিস’। এই রোগে পেটব্যথা থেকে শুরু করে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।
স্নেইল ফিভার সাধারণত অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধে সেরে যায়। তবে মালাউই লিভারপুল ওয়েলকাম ক্লিনিক্যাল রিসার্চ প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক জানেলিসা মুসায়াসহ অন্যান্য বিজ্ঞানী বলছেন, এই পরজীবীর নতুন কিছু ধরন পাওয়া গেছে, যেগুলো বর্তমানে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে ধরা নাও পড়তে পারে।
যেভাবে সংকট গভীর হচ্ছে গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের শরীরে থাকা পরজীবী আর প্রাণীর শরীরে থাকা পরজীবী একে অপরের সঙ্গে মিলে নতুন এক ‘হাইব্রিড’ তৈরি করছে। এগুলো মানুষ ও প্রাণী উভয়কেই আক্রান্ত করতে পারে। ফলে রোগের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা দিন দিন কঠিন হচ্ছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই হাইব্রিড পরজীবীগুলো মানুষের যৌনাঙ্গেও সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। তবে স্নেইল ফিভার শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কারণ, এদের ডিম মাইক্রোস্কোপে সাধারণ পরজীবীর মতো দেখায় না। অনেক সময় স্বাস্থ্যকর্মীরা এর উপসর্গগুলোকে যৌনবাহিত রোগ ভেবে ভুল করতে পারেন।
চিকিৎসা না হলে ইউরোজেনিটাল স্কিস্টোসোমিয়াসিস থেকে যৌনাঙ্গে ক্ষত, বন্ধ্যত্ব এবং এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে এই রোগের শারীরিক, সামাজিক ও সন্তান ধারণসংক্রান্ত প্রভাব আরও বেশি গুরুতর বলে মনে করা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, ভ্রমণ এবং মানুষের অভিবাসনের কারণে স্নেইল ফিভার ছড়াতে পারে। আর হাইব্রিড পরজীবী থাকলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন। ইতোমধ্যে দক্ষিণ ইউরোপের কিছু এলাকায় এমন হাইব্রিড সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্কিস্টোসোমিয়াসিস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রধান ডা. আমাদু গারবা জিরমে বলেন, ‘এটা এখন বৈশ্বিক উদ্বেগ। কিছু দেশে মানুষের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ নেই, কিন্তু প্রাণীদের শরীরে পরজীবীটি রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে সেটাই মানুষের জন্য ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।’
এই নতুন হুমকি মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের কৌশল বদল করছে।
dailymeghna.com
