প্রস্রাবে ফেনা : স্বাভাবিক নাকি কিডনি রোগের নীরব সংকেত

messenger sharing button
print sharing button

প্রস্রাব শরীরের বর্জ্যপদার্থ বের করে দেওয়ার পাশাপাশি আমাদের ভেতরের অনেক রোগের নীরব বার্তাবাহক হিসাবেও কাজ করে। প্রস্রাবে ফেনা দেখা দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। এ ফেনা কখনো কখনো কিডনি রোগের প্রাথমিক সতর্ক সংকেত হতে পারে। প্রস্রাব করার পর টয়লেটের পানির উপরিভাগে যদি সাবানের ফেনার মতো সাদা, ঘন ও স্থায়ী বুদবুদ দেখা যায়, তাকে আমরা সহজ ভাষায় প্রস্রাবে ফেনা বলি। সাধারণত স্বাভাবিক প্রস্রাবেও অল্প সময়ের জন্য বুদবুদ তৈরি হতে পারে, কিন্তু সেগুলো দ্রুত মিলিয়ে যায়। সমস্যা তখনই-যখন ফেনা বারবার হয়, ফেনা অনেকক্ষণ স্থায়ী থাকে ও প্রতিদিন প্রায় একই রকম দেখা যায়।

 

* ফেনা হওয়ার কারণ

সব ক্ষেত্রে প্রস্রাবে ফেনা মানেই রোগ নয়। কিছু পরিস্থিতিতে এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে পারে।

► দ্রুত বা জোরে প্রস্রাব করা : চাপের সঙ্গে প্রস্রাব বের হলে পানিতে বাতাস মিশে সাময়িক ফেনা তৈরি হয়, যা কয়েক সেকেন্ডেই মিলিয়ে যায়।

► শরীরে পানির ঘাটতি (Dehydration) : যখন শরীরে পানি কম থাকে, তখন প্রস্রাব ঘন হয়। ঘন প্রস্রাবে সামান্য ফেনা দেখা দিতে পারে।

► সকালের প্রথম প্রস্রাব : রাতভর প্রস্রাব জমে থাকার কারণে সকালের প্রস্রাব ঘন হয়ে ফেনা দেখা যেতে পারে।

► টয়লেট পরিষ্কারের কেমিক্যাল : টয়লেট বোলের ভেতরে থাকা সাবান বা ডিটারজেন্টের সঙ্গে প্রস্রাবের বিক্রিয়ায় ফেনা তৈরি হতে পারে।

 

* কখন উদ্বেগজনক

যদি প্রস্রাবে ফেনা প্রতিদিন হয়, ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে, শরীর ফুলে যাওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া বা ক্লান্তি থাকে-তাহলে এটি আর স্বাভাবিক বিষয় নয়।

 

* প্রধান রোগজনিত কারণ

► প্রস্রাবে প্রোটিন বের হওয়া : প্রস্রাবে ফেনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিপজ্জনক কারণ হলো প্রোটিন লিক হওয়া। স্বাভাবিকভাবে কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য ছেঁকে প্রস্রাব তৈরি করে এবং প্রয়োজনীয় প্রোটিন শরীরে রেখে দেয়। কিন্তু কিডনির ছাঁকনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রোটিন প্রস্রাবে চলে আসে। প্রোটিনের কারণে প্রস্রাবে ঘন, সাবানের মতো ফেনা তৈরি হয়। এটি কিডনি রোগের প্রথম লক্ষণ হতে পারে।

► ডায়াবেটিসজনিত কিডনি রোগ : দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালিকে নষ্ট করে। শুরুতে কোনো ব্যথা থাকে না। প্রথম লক্ষণ হিসাবে প্রস্রাবে প্রোটিন ও ফেনা দেখা দেয়। বাংলাদেশে কিডনি বিকলের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ডায়াবেটিস।

► উচ্চরক্তচাপ : উচ্চরক্তচাপ নীরবে কিডনির রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে কিডনির ফিল্টারিং ক্ষমতা কমে যায়, প্রস্রাবে প্রোটিন বের হয় ও প্রস্রাবে ফেনা দেখা দেয়।

► কিডনির প্রদাহজনিত রোগ : কিডনির ছাঁকনিতে প্রদাহ হলে প্রস্রাবে ফেনা হয়, কখনো রক্ত বের হয় ও শরীর ফুলে যায়।

► নেফ্রোটিক সিনড্রোম : এটি একটি গুরুতর অবস্থা- যেখানে প্রচুর প্রোটিন প্রস্রাবে যায়, প্রস্রাব অত্যন্ত ফেনাযুক্ত হয়, মুখ, পা ও শরীর ফুলে যায়।

► প্রস্রাবে সংক্রমণ : কিছু ক্ষেত্রে প্রস্রাবের সংক্রমণে ফেনা, দুর্গন্ধ, জ্বালা ও জ্বর দেখা দিতে পারে। যদিও এটি সাধারণত সাময়িক।

► পুরুষদের ক্ষেত্রে বীর্যজনিত কারণ : কিছু পুরুষের ক্ষেত্রে রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন বা বীর্যজনিত সমস্যার কারণে প্রস্রাবে ফেনা দেখা দিতে পারে।

 

* কোন লক্ষণগুলোয় বিশেষভাবে সতর্ক হতে হবে

চোখ, মুখ বা পা ফুলে যাওয়া, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা ও ডায়াবেটিস বা উচ্চরক্তচাপ থাকা।

 

* প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা

প্রস্রাবে ফেনা দীর্ঘদিন থাকলে এসব পরীক্ষাগুলো করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্রাবের ইউরিন এক্সামিনেশন (আর/ই), অ্যালবুমিন/প্রোটিন, অ্যাবুমিন ক্রিয়েটিনিন রেশিও, সিরাম ক্রিয়েটিনিন, ইজিএফআর, রক্তচাপ মাপা ও রক্তে শর্করা পরীক্ষা। Urine ACR বর্তমানে কিডনি রোগ শনাক্তের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাগুলোর একটি।

 

* করণীয়

► সাধারণ করণীয় : পর্যাপ্ত পানি পান করুন, অতিরিক্ত লবণ খাওয়া কমান, প্রস্রাব চেপে রাখবেন না ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন।

► ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ থাকলে : রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন। প্রয়োজনে কিডনি-সুরক্ষাকারী ওষুধ (ACE inhibitor/ARB) দেওয়া হয়।

 

* কখন দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন

শরীর হঠাৎ ফুলে গেলে, প্রস্রাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে, ফেনার সঙ্গে রক্ত বা তীব্র ব্যথা হলে, ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে নতুন করে ফেনা শুরু হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনো নিজে নিজে ওষুধ শুরু বা বন্ধ করবেন না।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা

 

About SIAM AHAMMED

Check Also

যে র’ক্তের গ্রুপে স্ট্রো’ক হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি

যে র’ক্তের গ্রুপে স্ট্রো’ক হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি নিজস্ব প্রতিবেদক: রক্তের গ্রুপের সঙ্গে ব্রেন স্ট্রোকের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *